বুধবার ২১ নভেম্বর ২০১৮   |  ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫   |   ১১ রবিউল আউয়াল, ১৪৪০
Untitled Document

বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা দুর্ভোগ

প্রকাশঃ রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮    ২১:৪৮
শাফিউল ইসলাম বাবু

‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’, ‘শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালো’, ‘কোন গাঁয়ে কোন ঘর কেউ রবে না নিরক্ষর’ প্রভৃতি প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে সরাসরি সক্রিয় ভুমিকা পালন করে থাকে শিক্ষক সমাজ। শিক্ষা হল মানুষের জীবন চলার পথে আলো। আলো ছাড়া যেমন কেউ পথ চলতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ছাড়াও প্রকৃত মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করা সম্ভব হয় না। গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস এর মতে- "পৃথিবীতে একটিই ভালো জিনিস, তা হলো শিক্ষা বা জ্ঞান। আর একটিই খারাপ জিনিস, তা হলো অজ্ঞতা।" এই অজ্ঞতা দূরিকরণে কাজ করেন শিক্ষকরা।

শিক্ষক শব্দের বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়ঃ
শিক্ষক= শি+ক+ষ+ক
শি= শিক্ষিত
ক= কর্তব্যপরায়ণ
ষ= ষড়ভিজ্ঞ অর্থাৎ দানশীল আর অপূর্ব জ্ঞান যার; এবং
ক= কৌশলী৷

এই জ্ঞানী, গুণী ও সম্মানী মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা তাদের জীবনের প্রায় পুরোটা সময় পার করেন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে। অথচ বৃদ্ধ বয়সে নিজেদের আজীবনের সঞ্চয় অবসর ও কল্যাণ ভাতার প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ায় তাদের ধরনা দিতে হয়। জীবদ্দশায় অনেকের কপালে জোটে না অবসর ভাতা। পরিতাপের বিষয়, অনেকে নিজের পেনশনের টাকা পাওয়ার আগেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে একরকম বিনা চিকিৎসায় মারাও গেছেন। অনেকেই বয়সের ভারে রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়েছেন, আবেদন করে খোঁজও নিতে পারছেন না।

বগুড়া জেলাধীন শিবগঞ্জ উপজেলার গুজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জানান, তিনি ২০১২ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তারপর থেকে তার সংসারে অভাব লেগেই আছে। তার তিন মেয়ে, এক ছেলে। ছেলের এখনো চাকরির ব্যবস্থা হয়নি এবং এরিমধ্যে ছেলেটি একটি সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মারাত্মক আহত হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বেশ কয়েকবার দেশের বাইরে নিতে হয়। মেয়েদের বিয়ে দেওয়া ও ছেলের চিকিৎসা ব্যয়ভারে তিনি এখন ঋণে জরাজীর্ণ। এমতাবস্থায় তিনি ব্যাপক টানাপড়েনের মধ্যদিয়ে দিনাতিপাত করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো বেশ কয়েকজন শিক্ষক জানান, উপার্জনের কোনো পথ খোলা না থাকায় তাদের চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হয় অবসর ভাতার দিকে। কিন্তু চেয়ে থাকতে থাকতে একসময় চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি মাসের বেতন থেকে ছয় শতাংশ হারে টাকা কেটে রাখা হয়। এর মধ্যে ৪ ভাগ যায় অবসর সুবিধা বোর্ডে এবং বাকি ২ শতাংশ কল্যাণ ট্রাস্টে। দুই খাতের সঙ্গে সরকারি অর্থ যোগ করে শিক্ষকদের পেনশন দেয়ার কথা।

অথচ দেশে বর্তমানে প্রায় ৭৬ হাজার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর গ্রহণের দীর্ঘদিন পরও অবসর ও কল্যাণ ভাতা পাচ্ছেন না। তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা ৪-৫ বছর ধরে অফিসে অফিসে ঘুরছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি পয়সাও হাতে পাননি। পরিকল্পিতভাবে আর্থিক সংকটের অজুহাত তুলে এদের ঘোরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে। বছরের পর বছর একই চেয়ারে বসে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি করে চলেছেন। যে কারণে আবেদন করে শিক্ষকদের বছরের পর বছর ঘুরতে হচ্ছে। এমনকি তাদের পেনশনের চেক ইস্যুও হয়ে যায়। কিন্তু ঘুষ না দিলে চেক মেলে না।

হয়রানির শিকার এক শিক্ষক জানান, গত মাসে তিনি এরকম একটি কাজ নিয়ে এক কর্মকর্তার সাথে দেখা করতে ঢাকায় যান। কর্মকর্তাকে ফোনে বলেন, স্যার আপনি কোথায় আছেন? তখন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি অমুক টাওয়ারে আছি, আমার সাথে দেখা করা এতই সহজ!’ অথচ তার সাথে ওই শিক্ষকের আগেই মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল। সে সময় ওই কর্মকর্তা কিছু টাকা দাবি করেছিলেন।

একটু খেয়াল করলেই আমরা হয়রানির এরকম অনেক ঘটনাই জানতে পারব৷ কিন্তু শিক্ষকরা অবসরে যাওয়ার পর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন- এর দায়ভার কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে। মন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে শিক্ষকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এটিকে চাকরির দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ব্রত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে অন্য পেশার তুলনায় অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা সত্ত্বেও অনেকে এই মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। এটা অজানা নয়, বেসরকারি শিক্ষকরা বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধা নামমাত্র পেয়ে থাকেন। ফলে অনেক শিক্ষকেরই জীবন কাটে দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে। সঞ্চিত পেনশন দিয়ে শেষ বয়সে ভাল কিছু করার স্বপ্ন থাকে তাদের। তবে লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর স্বপ্ন গড়া শিক্ষকদের এই স্বপ্ন অনেক সময় অধরাই রয়ে যায়।

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষার মেরুদণ্ড শিক্ষক। এজন্য জাতির সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে শিক্ষকরা ভূমিকা পালন কড়ে থাকেন। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, ভুক্তভোগী এই শিক্ষক-কর্মচারীদের কথা একটু ভাবুন। আগে যেখানে এক বছরের মধ্যে কল্যাণ ভাতা ও অবসর ভাতা দিতে দেওয়া হত, এখন তথ্য-প্রযুক্তির যুগে এসে তা সম্ভব হচ্ছে না কেন? এ অবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দুঃখ-কষ্টের কথা আমলে নিয়ে এক বছরের মধ্যে যেন অবসর ভাতা ও কল্যাণ ভাতা পেতে পারেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।

সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে এর জন্য আমাদের কেউও সহযোগীতার হাত বারিয়ে দিতে হবে। যাতে করে জীবনসায়াহ্নে এসে এই শিক্ষকরা হয়রানিমুক্তভাবে নিজেদের অধিকার ভোগ করতে পারেন- এটাই আমাদের কাম্য।

লেখকঃ শাফিউল ইসলাম বাবু, প্রভাষক
babu.guzia@gmail.com

SRM Institutes of Science and Technology Ad Space India Education Fair 2018, Dhaka
আর্কাইভ
November 2018
SunMonTueWedThuFriSat
1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

AIMS Institutes

প্রকাশক

বিপ্লব চন্দ্র চক্রবর্তী

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক

রবিউল ইসলাম তুষার

আমাদের সাথে থাকুন
© Copyright 2017. GEE BD. Designed and Developed by GEE IT